ফ্রান্সের প্রায় সমস্ত পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের জন্য তাদের দরজা খোলা রাখে। ব্যাচেলর, মাস্টার্স, বা পিএইচডি – যেকোনো পর্যায়েই আপনি ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারেন। ফ্রান্সের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের শিক্ষা এবং গবেষণার জন্য বিখ্যাত, এবং এগুলোর টিউশন ফি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় এবং স্বনামধন্য কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা নিচে দেওয়া হলো।
প্যারিসের সেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়:
প্যারিসকে বলা হয় শিক্ষার্থীদের শহর। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঐতিহাসিক এবং বিশ্ব র্যাঙ্কিং-এ প্রথম সারিতে অবস্থান করে।
সোরবোন ইউনিভার্সিটি (Sorbonne University): কলা, মানবিক, বিজ্ঞান এবং চিকিৎসাশাস্ত্রের জন্য এটি ফ্রান্সের অন্যতম সেরা এবং প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়।
প্যারিস সাইন্স এ লেটারস (PSL Research University Paris): এটি বেশ কয়েকটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ব র্যাঙ্কিং-এ ধারাবাহিকভাবে শীর্ষস্থান দখল করে আছে।
ইউনিভার্সিটি প্যারিস-স্যাকলে (Université Paris-Saclay): বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতিসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠান।
সায়েন্সেস পো (Sciences Po): রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য এটি বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
ইউনিভার্সিটি Paris 1 Pantheon-সোরবোন (Université Paris 1 Panthéon-Sorbonne): আইন, অর্থনীতি, এবং মানবিকীর জন্য এটি অত্যন্ত সুপরিচিত।
ইউনিভার্সিটি প্যারিস সিতে (Université Paris Cité): স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, বিজ্ঞান এবং মানবিকের সমন্বয়ে গঠিত একটি আধুনিক ও উদ্ভাবনী বিশ্ববিদ্যালয়।
ইনস্টিটিউট পলিটেকনিক ডি প্যারিস (Institut Polytechnique de Paris): এটি ফ্রান্সের শীর্ষস্থানীয় ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলগুলোর একটি জোট।
এছাড়াও, INSEAD এবং HEC Paris-এর মতো বিজনেস স্কুলগুলো এমবিএ এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রোগ্রামের জন্য বিশ্বসেরা।
প্যারিসের বাইরের সেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়:
প্যারিস ছাড়াও ফ্রান্সের অন্যান্য শহরে বিশ্বমানের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে জীবনযাত্রার খরচও তুলনামূলকভাবে কম।
ইউনিভার্সিটি ডি লিওঁ (Université de Lyon): এটি ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লিওঁ-তে অবস্থিত এবং বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চমানের শিক্ষা প্রদান করে।
গ্রেনোবল আল্পস ইউনিভার্সিটি (Université Grenoble Alpes): বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এটি একটি উদ্ভাবনী কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এক্স-মার্সেই ইউনিভার্সিটি (Aix-Marseille University): ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার দিক থেকে এটি ফ্রান্সের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত কোর্স অফার করে।
ইউনিভার্সিটি অফ স্ট্রাসবুর্গ (University of Strasbourg): জার্মানির সীমান্তে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং গবেষণার জন্য পরিচিত।
ইউনিভার্সিটি অফ বর্দো (University of Bordeaux): ওয়াইন এবং প্রত্নতত্ত্বের জন্য বিখ্যাত হলেও, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতেও অনেক এগিয়ে।
ইউনিভার্সিটি অফ মঁপেলিয়ে (University of Montpellier): চিকিৎসাশাস্ত্র এবং পরিবেশ বিজ্ঞানের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু একাডেমিক দিক দিয়েই সেরা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন সাপোর্ট সার্ভিস, স্কলারশিপ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও দিয়ে থাকে। আবেদনের আগে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ভালোভাবে দেখে আপনার পছন্দের বিষয় এবং ভর্তির যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন।
কয়েকটি ভালো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা:
ফ্রান্সে বিশ্বমানের অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও Grande Écoles (বিশেষায়িত সেরা প্রতিষ্ঠান) রয়েছে, বিশেষ করে বিজনেস এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়গুলোর জন্য। নিচে কয়েকটি সেরা প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেওয়া হলো:
বিজনেস ও ম্যানেজমেন্টের জন্য: 🧑💼
HEC Paris: বিশ্বের অন্যতম সেরা বিজনেস স্কুল।
INSEAD: এমবিএ এবং এক্সিকিউটিভ প্রোগ্রামের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত।
ESSEC Business School: ম্যানেজমেন্ট এবং ফিন্যান্সের জন্য সুপরিচিত।
ESCP Business School: বিশ্বের প্রথম বিজনেস স্কুল, যার ইউরোপজুড়ে একাধিক ক্যাম্পাস রয়েছে।
EDHEC Business School: ফিন্যান্স এবং বিজনেস ম্যানেজমেন্টে এর সুনাম রয়েছে।
SKEMA Business School: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বিজনেস স্কুল।
ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজির জন্য: 🛠
EPITA School of Computer Science: কম্পিউটার সায়েন্স এবং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর জন্য ফ্রান্সের অন্যতম সেরা একটি প্রতিষ্ঠান।
ESTACA – Engineering School: অ্যারোনটিক্যাল, অটোমোটিভ এবং স্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং-এর জন্য বিখ্যাত।
IÉSEG School of Management: যদিও এটি একটি বিজনেস স্কুল, তবে তাদের টেকনোলজি ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামগুলো বেশ উন্নত।
EPF School of Engineering: জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর টিউশন ফি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে অনেক বেশি, তবে এদের শিক্ষা ও গবেষণার মান অত্যন্ত উঁচু এবং চাকরির বাজারে এদের ডিগ্রির অনেক মূল্য রয়েছে।
আবেদনের সাধারণ প্রক্রিয়া
আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের জন্য ফ্রান্সে আবেদন প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে গোছানো। বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীকে ক্যাম্পাস ফ্রান্স (Campus France)-এর “Etudes en France” পদ্ধতির মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। এই প্রক্রিয়াটি আপনার আবেদন এবং ভিসা প্রক্রিয়াকে সহজ করে তোলে।
*আবেদনের প্রধান ধাপগুলো হলো:
১. কোর্স এবং বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন: প্রথমে আপনার পছন্দের বিষয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া থাকে।
২. ভাষার দক্ষতা: ফ্রান্সে ফরাসি এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই কোর্স করার সুযোগ রয়েছে।
* ফরাসি ভাষার কোর্স: ফরাসি ভাষায় পড়তে চাইলে আপনাকে DELF, DALF, বা TCF-এর মতো ভাষা দক্ষতার সার্টিফিকেট দেখাতে হবে।
* ইংরেজি ভাষার কোর্স: ইংরেজি ভাষায় পড়াশোনার জন্য সাধারণত IELTS বা TOEFL স্কোরের প্রয়োজন হয়। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বা বিজনেস স্কুল আইইএলটিএস ছাড়াও ভর্তি নেয়।
৩. অনলাইনে আবেদন: “Etudes en France” পোর্টালে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে প্রয়োজনীয় তথ্য এবং নথি (যেমন: একাডেমিক সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট, সিভি, মোটিভেশন লেটার) আপলোড করতে হয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি তাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও আবেদন গ্রহণ করে।
৪. ভিসার জন্য আবেদন: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পাওয়ার পর, আপনাকে স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। ক্যাম্পাস ফ্রান্সের মাধ্যমে আবেদন করলে এই প্রক্রিয়াটি আরও সহজ হয়।
ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের স্বাগত জানায় এবং তাদের জন্য বিভিন্ন স্কলারশিপের সুযোগও রয়েছে, যেমন আইফেল এক্সিলেন্স স্কলারশিপ এবং ইরাসমুস মুন্ডাস স্কলারশিপ। সঠিক তথ্য ও প্রস্তুতি নিয়ে আবেদন করলে ফ্রান্সের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব।
ক্যাম্পাস ফ্রান্স (Campus France)-এর মাধ্যমে আবেদন করার প্রক্রিয়া:
“Études en France” (ফ্রান্সে অধ্যয়ন) নামক একটি অনলাইন পদ্ধতির মাধ্যমে এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়।
এখানে ধাপে ধাপে নির্দেশিকা দেওয়া হলো:
ধাপ ১: আপনার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন
প্রথমেই আপনাকে “Études en France” ওয়েবসাইটে গিয়ে একটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে।
ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন: আপনার দেশের জন্য নির্ধারিত ক্যাম্পাস ফ্রান্স ওয়েবসাইটে যান। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ থেকে আবেদন করলে “Pastel diplomatie gouv fr en” লিখে গুগলে সার্চ করতে পারেন বা সরাসরি আপনার দেশের ক্যাম্পাস ফ্রান্স অফিসের ওয়েবসাইটে যেতে পারেন।
রেজিস্ট্রেশন: “Register” বা “S’inscrire” অপশনে ক্লিক করে আপনার ইমেইল ঠিকানা এবং অন্যান্য প্রাথমিক তথ্য দিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন। আপনার ইমেইলে একটি ভেরিফিকেশন লিঙ্ক পাঠানো হবে, সেটিতে ক্লিক করে অ্যাকাউন্টটি সক্রিয় করুন।
ধাপ ২: ব্যক্তিগত এবং শিক্ষাগত তথ্য পূরণ করুন
অ্যাকাউন্ট তৈরি করার পর, আপনাকে আপনার প্রোফাইলের বিভিন্ন অংশ পূরণ করতে হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য (Personal Information): আপনার নাম, জন্মতারিখ, পাসপোর্টের তথ্য এবং যোগাযোগের ঠিকানা নির্ভুলভাবে পূরণ করুন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা (Educational Background): আপনার মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, এবং যদি থাকে, ব্যাচেলর ডিগ্রির সমস্ত তথ্য, পাশের বছর, বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাপ্ত নম্বর বা গ্রেড যোগ করুন।
ভাষার দক্ষতা (Language Skills): আপনার ফরাসি বা ইংরেজি ভাষার দক্ষতার প্রমাণপত্র (DELF/DALF/TCF বা IELTS/TOEFL) সম্পর্কিত তথ্য এখানে যোগ করুন।
ধাপ ৩: কোর্স এবং বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করুন (Program Selection)
এই ধাপটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আপনি যে প্রোগ্রাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আবেদন করতে আগ্রহী, সেগুলির একটি তালিকা তৈরি করবেন।
”Panier de formations” (প্রোগ্রামের ঝুড়ি): এই অংশে আপনি আপনার পছন্দের কোর্স এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যোগ করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন: আপনি সাধারণত নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারবেন (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সাধারণত ৩টি এবং আর্কিটেকচার স্কুলের জন্য ২টি)।
প্রেরণা পত্র (Motivation Letter): প্রতিটি নির্বাচিত প্রোগ্রামের জন্য আপনাকে আলাদাভাবে আপনার আগ্রহ এবং যোগ্যতার কারণ ব্যাখ্যা করে একটি “Letter of Motivation” বা “Lettre de Motivation” লিখতে হবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই সময় নিয়ে যত্ন সহকারে লিখুন।
ধাপ ৪: প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করুন:
আপনার প্রোফাইলে দেওয়া তথ্যের সমর্থনে আপনাকে নিম্নলিখিত নথিগুলোর স্ক্যান কপি আপলোড করতে হবে:
পাসপোর্ট: আপনার ছবির পাতা।
ছবি: সাম্প্রতিক তোলা একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ও সার্টিফিকেট: মাধ্যমিক থেকে শুরু করে আপনার সর্বশেষ ডিগ্রির সমস্ত সার্টিফিকেট এবং মার্কশিট। প্রয়োজনে ফরাসি বা ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ এবং নোটারি করাতে হতে পারে।
ভাষার দক্ষতার সার্টিফিকেট: IELTS/TOEFL বা DELF/DALF/TCF স্কোরের সার্টিফিকেট।
সিভি (CV)/বায়োডাটা: একটি ইউরোপাস (Europass) ফরম্যাটের সিভি তৈরি করা ভালো।
মোটিভেশন লেটার: প্রতিটি নির্বাচিত প্রোগ্রামের জন্য।
সুপারিশ পত্র (Recommendation Letters): কিছু প্রোগ্রামের জন্য প্রয়োজন হতে পারে।
ধাপ ৫: আবেদন জমা দিন এবং ফি পরিশোধ করুন
সমস্ত তথ্য এবং নথি আপলোড করার পর, আপনার আবেদনটি চূড়ান্তভাবে জমা বা “Submit” করতে হবে।
আবেদন জমা: “I submit my file” বা “Je soumets mon dossier” অপশনে ক্লিক করুন।
ফি প্রদান: আবেদন জমা দেওয়ার পর আপনাকে ক্যাম্পাস ফ্রান্সের আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ফি প্রদান করতে হবে। ফি প্রদানের পদ্ধতি আপনার দেশের ক্যাম্পাস ফ্রান্স অফিস নির্ধারণ করে দেবে (সাধারণত ব্যাংক ড্রাফট বা অনলাইন ট্রান্সফারের মাধ্যমে)।
ধাপ ৬: ক্যাম্পাস ফ্রান্সের সাক্ষাৎকার (Interview)
ফি প্রদানের পর, ক্যাম্পাস ফ্রান্স আপনার আবেদনটি পর্যালোচনা করবে। যদি সব ঠিক থাকে, তাহলে আপনাকে একটি সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হবে।
সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ: আপনাকে অনলাইন পোর্টালেই সাক্ষাৎকারের জন্য একটি তারিখ এবং সময় বেছে নিতে বলা হবে।
সাক্ষাৎকার: এই সাক্ষাৎকারে আপনার একাডেমিক প্রোফাইল, ফ্রান্সে কেন পড়তে যেতে চান, আপনার নির্বাচিত কোর্স এবং আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন করা হবে। এর উদ্দেশ্য হলো আপনার আবেদনটির যোগ্যতা যাচাই করা।
ধাপ ৭: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সাক্ষাৎকারের পর, ক্যাম্পাস ফ্রান্স আপনার আবেদনটি আপনার নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পাঠিয়ে দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আপনার আবেদন পর্যালোচনা করে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে।
আপনি পোর্টালেই দেখতে পারবেন কোন বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে ভর্তির সুযোগ (Offer Letter) দিয়েছে।
অফার লেটার পাওয়ার পর আপনাকে একটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করতে হবে।
এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার পরেই আপনি স্টুডেন্ট ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন। ক্যাম্পাস ফ্রান্স থেকে প্রাপ্ত “Attestation” বা সম্মতিপত্রটি ভিসা আবেদনের জন্য একটি অপরিহার্য নথি।
টিউশন ফি (Tuition Fees):
ফ্রান্সে টিউশন ফি নির্ভর করে আপনি কোন ধরণের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছেন তার উপর—সরকারি (Public) নাকি বেসরকারি (Private)।
১. সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (Public Universities)
ফ্রান্সের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টিউশন ফি সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং তুলনামূলকভাবে অনেক কম, কারণ সরকার শিক্ষার একটি বড় অংশ ভর্তুকি দেয়। তবে নন-ইউরোপীয় (Non-EU/EEA) ছাত্রছাত্রীদের জন্য ফি ইউরোপীয়দের চেয়ে কিছুটা বেশি।
২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের সরকারিভাবে নির্ধারিত বার্ষিক ফি হলো:
স্নাতক বা ব্যাচেলর (Licence): প্রায় €2,770 প্রতি বছর (প্রায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা)।
মাস্টার্স (Master): প্রায় €3,770 প্রতি বছর (প্রায় ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা)।
পিএইচডি (PhD): প্রায় €380 প্রতি বছর (প্রায় ৪৫ হাজার টাকা)।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের উদ্যোগে নন-ইউরোপীয় ছাত্রছাত্রীদের জন্যেও ইউরোপীয়দের সমান ফি (partial exemption) ধার্য করে, যা অনেক কম (ব্যাচেলরের জন্য প্রায় €170 এবং মাস্টার্সের জন্য প্রায় €243)। তাই আবেদনের আগে নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে তাদের টিউশন ফি সংক্রান্ত নীতি দেখে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
২. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (Private Universities & Grande Écoles):
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে বিজনেস স্কুল, ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল এবং অন্যান্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর (Grande Écoles) টিউশন ফি অনেক বেশি।
টিউশন ফি: এগুলোর ফি সাধারণত প্রতি বছর €5,000 থেকে €20,000 বা তারও বেশি হতে পারে (প্রায় ৬ লক্ষ থেকে ২৪ লক্ষ টাকা)।
অন্যান্য খরচ
টিউশন ফি ছাড়াও, আপনাকে প্রতি বছর CVEC (Student and Campus Life Contribution) নামে একটি ফি প্রদান করতে হবে, যা বর্তমানে প্রায় €100 (প্রায় ১২ হাজার টাকা)। এটি ছাত্রজীবনের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হয়।
আবেদন প্রক্রিয়ায় কতদিন সময় লাগে? (Application Timeline):
ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সাধারণত, ক্লাস শুরু হওয়ার প্রায় এক বছর আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু করতে হয়। সেপ্টেম্বরে সেশন শুরু হয় ধরে নিয়ে একটি সাধারণ সময়রেখা নিচে দেওয়া হলো:
মোট সময়: প্রায় ৮ থেকে ১০ মাস
ধাপ ১: গবেষণা ও প্রস্তুতি (সেপ্টেম্বর – ডিসেম্বর)
সময়: ৩-৪ মাস
করণীয়: আপনার পছন্দের কোর্স ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গবেষণা করা। ভাষার দক্ষতার পরীক্ষার (IELTS/DELF) জন্য প্রস্তুতি নেওয়া ও পরীক্ষা দেওয়া। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, যেমন একাডেমিক সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট, সিভি ইত্যাদি গোছানো।
ধাপ ২: ক্যাম্পাস ফ্রান্সে আবেদন (অক্টোবর – জানুয়ারি)
সময়: ২-৩ মাস
করণীয়: “Études en France” পোর্টালে অ্যাকাউন্ট খুলে আবেদনপত্র পূরণ করা, মোটিভেশন লেটার লেখা এবং প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করা। বেশিরভাগ দেশের জন্য আবেদনের সময়সীমা ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারির শুরুতে শেষ হয়ে যায়। এই সময়সীমাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ধাপ ৩: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তর প্রাপ্তি (ফেব্রুয়ারি – মে)
সময়: ২-৩ মাস
করণীয়: এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আপনার আবেদন পর্যালোচনা করে। আপনি “Études en France” পোর্টালেই তাদের সিদ্ধান্ত (গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান) দেখতে পারবেন। একই সাথে আপনাকে ক্যাম্পাস ফ্রান্সের সাক্ষাৎকারের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
ধাপ ৪: চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও ভিসা আবেদন (জুন – আগস্ট)
সময়: ২-৩ মাস
করণীয়: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পাওয়ার পর একটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করতে হবে। এরপর ক্যাম্পাস ফ্রান্স থেকে “Attestation” বা ছাড়পত্র নিয়ে আপনাকে স্টুডেন্ট ভিসার জন্য ফরাসি দূতাবাসে আবেদন করতে হবে।
ধাপ ৫: ফ্রান্সে আগমন (আগস্ট – সেপ্টেম্বর)
ভিসা পাওয়ার পর সেপ্টেম্বরে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে ফ্রান্সে পৌঁছানো এবং বাসস্থান ও অন্যান্য বিষয়গুলো গুছিয়ে নেওয়া।
সুতরাং, আপনি যদি আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে পড়াশোনা শুরু করতে চান, তবে আপনাকে এই বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। তাড়াতাড়ি আবেদন শুরু করা সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।
ভিসা আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস
ফ্রান্সের স্টুডেন্ট ভিসার জন্য সাধারণত নিম্নলিখিত ডকুমেন্টস জমা দিতে হয়। তালিকাটি ভালোভাবে মিলিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে:
১. সাধারণ ডকুমেন্টস:
ভিসা আবেদন ফর্ম: সঠিকভাবে পূরণ করা এবং স্বাক্ষর করা দীর্ঘমেয়াদী ভিসার আবেদনপত্র।
পাসপোর্ট: কমপক্ষে এক বছরের মেয়াদসহ একটি বৈধ পাসপোর্ট এবং পুরনো পাসপোর্ট (যদি থাকে)। পাসপোর্টে অন্তত দুটি খালি পৃষ্ঠা থাকতে হবে।
ছবি: সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে তোলা ৩৫x৪৫ মিমি সাইজের দুই কপি সাম্প্রতিক রঙিন ছবি।
Campus France থেকে প্রাপ্ত সম্মতিপত্র (Attestation EEF): “Etudes en France” প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর ক্যাম্পাস ফ্রান্স থেকে এই ডকুমেন্টটি দেওয়া হবে, যা ভিসার জন্য অপরিহার্য।
২. একাডেমিক ডকুমেন্টস:
বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার: ফ্রান্সের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া চূড়ান্ত ভর্তির অফার লেটার।
সকল একাডেমিক সার্টিফিকেট ও মার্কশিট: মাধ্যমিক থেকে শুরু করে আপনার সর্বশেষ ডিগ্রির মূল সার্টিফিকেট ও মার্কশিট। প্রয়োজনে ফরাসি বা ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ ও নোটারি করা লাগতে পারে।
ভাষার দক্ষতার সার্টিফিকেট: ইংরেজি কোর্সের জন্য IELTS/TOEFL এবং ফরাসি কোর্সের জন্য DELF/DALF/TCF এর সনদ।
৩. আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রমাণ:
ব্যাংক স্টেটমেন্ট: আপনার বা আপনার স্পন্সরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিগত ৬ মাসের স্টেটমেন্ট।
ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট: ব্যাংক থেকে আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রমাণপত্র। ফ্রান্সে এক বছরের জীবনযাত্রার খরচের জন্য ন্যূনতম €615 প্রতি মাস হিসেবে পর্যাপ্ত অর্থ দেখাতে হয়।
স্পন্সরের তথ্য: যদি কেউ আপনার খরচ বহন করে, তাহলে তার পাসপোর্টের কপি, পেশার প্রমাণপত্র এবং আপনার সাথে তার সম্পর্ক প্রমাণের জন্য এফিডেভিট (Affidavit of Support)।
৪. অন্যান্য জরুরি ডকুমেন্টস:
বাসস্থানের প্রমাণ: ফ্রান্সে প্রথম তিন মাসের জন্য আপনার বাসস্থানের প্রমাণপত্র। এটি হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরির রিজার্ভেশন, ভাড়াবাড়ির চুক্তিপত্র অথবা কোনো আত্মীয়ের বাসার ঠিকানার প্রমাণ (attestation d’accueil)।
ফ্লাইট রিজার্ভেশন: বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত যাওয়ার একটি প্রাথমিক ফ্লাইট বুকিং-এর কপি।
মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স: আপনার সম্পূর্ণ কোর্সের সময়কালের জন্য বৈধ একটি মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স।
বাংলাদেশ থেকে ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট:
বাংলাদেশ থেকে ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:
১. ক্যাম্পাস ফ্রান্সের মাধ্যমে শুরু: ছাত্র ভিসার জন্য আবেদনকারীদের প্রথমে ক্যাম্পাস ফ্রান্স বাংলাদেশ-এর সাথে যোগাযোগ করে “Etudes en France” প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয়।
২. সাক্ষাৎকারের আমন্ত্রণ: আপনার ফাইল পর্যালোচনা এবং সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হওয়ার পর, ক্যাম্পাস ফ্রান্স আপনার আবেদনটি ভিসা সেকশনে পাঠিয়ে দেবে।
৩. দূতাবাস থেকে যোগাযোগ: এরপর ঢাকার ফরাসি দূতাবাসের ভিসা সেকশন থেকে আপনাকে ইমেইলের মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য একটি নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় জানিয়ে দেওয়া হবে।
তাই সরাসরি দূতাবাসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার আগে ক্যাম্পাস ফ্রান্সের প্রক্রিয়া শেষ করা বাধ্যতামূলক।
কিছু জরুরি পরামর্শ:
আবেদনের সময়সীমার অনেক আগে থেকেই প্রক্রিয়া শুরু করুন।
সব নথি প্রস্তুত রাখুন এবং নির্ভুল তথ্য প্রদান করুন।
আপনার দেশের ক্যাম্পাস ফ্রান্স অফিসের ওয়েবসাইটে দেওয়া নির্দেশিকা এবং সময়সীমাগুলো নিয়মিত দেখুন।
